আবদুলমুত্তালিব এর সম্পুন্ন জিবনি ইসলামিক পোস্ট সম্পর্কে বিস্তারিত পড়ুন
- আসল নাম: শায়বা ইবনে হাশিম। জন্মের সময় তার মাথায় কিছু সাদা চুল থাকায় তাকে ‘শায়বা’ (বৃদ্ধ) বলা হতো।
- পিতা ও বংশ: তিনি কুরাইশ বংশের হাশিম ইবনে আবদে মানাফের পুত্র।
- নামকরণ: তার চাচা মুত্তালিব তাকে মদীনা থেকে মক্কায় নিয়ে আসেন। মক্কায় প্রবেশের সময় লোকেরা তাকে মুত্তালিবের দাস ভেবে ‘আবদুল মুত্তালিব’ (মুত্তালিবের দাস) বলে ডাকতে শুরু করে এবং পরবর্তীতে এই নামেই তিনি পরিচিত হন।
- জমজম কূপ পুনঃখনন: দীর্ঘকাল পরিত্যক্ত থাকার পর তিনি গায়েবি নির্দেশে জমজম কূপটি খুঁজে পান এবং এটি পুনরায় খনন করেন।
- আবরাহার আক্রমণ ও হস্তিবাহিনী: ইয়েমেনের শাসক আবরাহা যখন হাতি নিয়ে কাবা ঘর ধ্বংস করতে আসে, তখন আবদুল মুত্তালিব অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন এবং বলেছিলেন, “আমি এই উটগুলোর মালিক, আর কাবা ঘরের মালিক আল্লাহ, তিনি নিজেই একে রক্ষা করবেন”।
- হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর লালন-পালন: নবীজির পিতা আবদুল্লাহ তাঁর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেন। নবীজির জন্মের পর আবদুল মুত্তালিব অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং তাকে কাবায় নিয়ে গিয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। মাতার মৃত্যুর পর ৮ বছর বয়স পর্যন্ত নবীজি তাঁরই তত্ত্বাবধানে ছিলেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য সন্তানদের মধ্যে ছিলেন আবদুল্লাহ (নবীজির পিতা), আবু তালিব, হামজা (রা.) এবং আব্বাস (রা.)।
তিনি আনুমানিক ৫৭৮ খ্রিস্টাব্দে মক্কায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর সময় হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বয়স ছিল মাত্র ৮ বছর।
১. জমজম কূপ পুনঃখননের বিস্তারিত ঘটনা [1]
- স্বপ্ন ও নির্দেশনা: আবদুল মুত্তালিব পরপর কয়েকদিন স্বপ্নে দেখেন যে কেউ তাঁকে ‘জমজম’ খনন করতে বলছেন। স্বপ্নের চতুর্থ রাতে তাঁকে নির্দিষ্ট স্থানটি বুঝিয়ে দেওয়া হয়, যা ছিল কাবার কাছে দুটি মূর্তির (ইসফ ও নায়েলা) মাঝখানে।
- খনন কাজ: তিনি তাঁর একমাত্র পুত্র হারিসকে সাথে নিয়ে খনন শুরু করেন। খনন করতে করতে যখন তিনি কূপের মুখ খুঁজে পান, তখন তিনি সজোরে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে ওঠেন। [5, 9, 10, 11]
- গুপ্তধন প্রাপ্তি: খননকালে কূপের ভেতর থেকে আগের গোত্রগুলোর পুঁতে রাখা সোনার হরিণ, তলোয়ার এবং মূল্যবান গয়না পাওয়া যায়।
- কুরবানির মানত: খননের সময় কুরাইশরা যখন তাঁর বিরোধিতা করছিল, তখন তিনি মানত করেছিলেন যে, যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে ১০ জন পুত্র সন্তান দেওয়া হয়, তবে তিনি তাঁদের একজনকে আল্লাহর নামে কুরবানি করবেন। পরবর্তীতে ১০ জন পুত্র হওয়ার পর লটারিতে নবীজির পিতা আবদুল্লাহর নাম আসে, কিন্তু পরে ১০০টি উট কুরবানি দিয়ে তাঁকে মুক্ত করা হয়।
২. আবদুল মুত্তালিবের পরিবার ও সন্তান
- পুত্রগণ:
- হারিস: তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র, জমজম খননের সময় তিনি সাথে ছিলেন।
- আবদুল্লাহ: নবীজি (সা.)-এর পিতা।
- আবু তালিব: নবীজির শৈশব ও যৌবনের অভিভাবক এবং আলীর (রা.) পিতা।
- হামজা (রা.): ইসলামের বীর এবং নবীজির চাচা।
- আব্বাস (রা.): আব্বাসীয় বংশের আদি পুরুষ।
- আবু লাহাব: নবীজির ঘোর বিরোধী চাচা।
- অন্যান্য পুত্র: জুবায়ের, গাইদাক, মাকহুম (মুকায়উয়িম), সাফার (দিরার)।
- কন্যাগণ:
- আতিকা, উম্মে হাকিম (বায়দা), উমামা, আরওয়া, বাররাহ এবং সাফিয়া (রা.)।
- ফাতিমা বিনতে আমর (আবদুল্লাহ ও আবু তালিবের মা)
- হালা বিনতে উহাইব (হামজার মা)
- নাতিল বিনতে খুবাব (আব্বাসের মা)
- সুমরা বিনতে জান্দাব এবং লুবনা বিনতে হাজিরা
মানত করার কারণ
লটারিতে আবদুল্লাহর নাম
কুরাইশদের বাধা ও পরামর্শ
১০০টি উট দিয়ে মুক্তিপন
- লটারি প্রক্রিয়া: একদিকে আবদুল্লাহর নাম এবং অন্যদিকে ১০টি উট রেখে লটারি শুরু হয়। প্রথমবার আবদুল্লাহর নাম উঠলে আরও ১০টি উট বাড়ানো হয়।
- উটের সংখ্যা বৃদ্ধি: এভাবে উটের সংখ্যা ২০, ৩০, ৪০ করে বাড়তে থাকে এবং প্রতিবারই আবদুল্লাহর নাম বের হতে থাকে।
- চূড়ান্ত ফলাফল: যখন উটের সংখ্যা ১০০ এ পৌঁছায়, তখন লটারিতে উটের নাম ওঠে। নিশ্চিত হওয়ার জন্য আবদুল মুত্তালিব আরও তিনবার লটারি করেন এবং প্রতিবারই উটের নাম আসে।
ঘটনার প্রভাব
- কুরবানি: আবদুল মুত্তালিব খুশি হয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন এবং সেই ১০০টি উট কুরবানি করে গোশত মক্কার সকল মানুষ ও পশুপাখির জন্য উন্মুক্ত করে দেন।
- দিয়াতের নিয়ম: এই ঘটনার পর থেকে আরবে খুনের বা জীবনের বিনিময়ে রক্তপণ ১০টি উট থেকে বাড়িয়ে ১০০টি উটে নির্ধারিত হয়, যা ইসলামেও বহাল রাখা হয়েছে।
- নবীজি (সা.)-এর উক্তি: নবীজি (সা.) প্রায়ই বলতেন, “আমি দুই জবাইকৃতের সন্তান”—এখানে তিনি তাঁর পূর্বপুরুষ হযরত ইসমাইল (আ.) এবং পিতা আবদুল্লাহর কুরবানি হওয়ার ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করেছেন। [5, 18, 20]
১. মূল বংশধারা (পিতার দিক থেকে):
- আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম
- ইবনে আবদে মানাফ
- ইবনে কুসাই
- ইবনে কিলাব
- ইবনে মুররাহ
- ইবনে কা’ব
- ইবনে লুয়াই
- ইবনে গালিব
- ইবনে ফিহর (যাঁকে কুরাইশ বলা হয়)
- ইবনে মালিক
- ইবনে নাযর
- ইবনে কিনানা… (এই ধারা হযরত ইসমাইল (আ.) পর্যন্ত বিস্তৃত)। [1]
২. কেন তাঁকে ‘হাশিমী’ বলা হয়?
৩. কেন তাঁর নাম ‘আবদুল মুত্তালিব’?
৪. বংশের মর্যাদা ও দায়িত্ব:
- সিিকায়া: হাজীদের পানি পান করানো (জমজম কূপের দায়িত্ব)।
- রিফাদা: হাজীদের খাবার ও আপ্যায়নের ব্যবস্থা করা।
১. আবু তালিব: পরম আশ্রয়দাতা ও অভিভাবক
- শৈশবের অভিভাবক: আবদুল মুত্তালিবের মৃত্যুর পর ৮ বছর বয়সী মুহাম্মদ (সা.)-এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন আবু তালিব। নিজের সন্তানদের চেয়েও তিনি ভাতিজাকে বেশি ভালোবাসতেন।
- ব্যবসায়িক শিক্ষা: কিশোর বয়সে তিনি নবীজিকে সিরিয়ায় ব্যবসায়িক সফরে নিয়ে যান, যেখানে নবীজির সততা ও নবী হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণগুলো ফুটে উঠেছিল।
- নিরাপত্তা নিশ্চিত করা: নবুওয়াত প্রাপ্তির পর যখন কুরাইশরা নবীজিকে হত্যার হুমকি দেয়, তখন আবু তালিব বুক দিয়ে তাঁকে আগলে রাখেন। তিনি বলেছিলেন, “যতক্ষণ আমি বেঁচে আছি, কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।”
- শেবে আবু তালিবে বন্দি: নবীজিকে রক্ষা করতে গিয়ে তিনি তাঁর গোত্রসহ তিন বছর গিরিসঙ্কটে (শেবে আবু তালিব) চরম অভাব ও অনাহারে বন্দি জীবন কাটান।
- মৃত্যু: তিনি আমৃত্যু নবীজিকে সমর্থন দিলেও শেষ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন কি না, তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তাঁর মৃত্যুকে নবীজি (সা.) এতই শোকাতুর হয়েছিলেন যে ওই বছরকে ‘আমুল হুজন’ বা শোকের বছর বলা হয়।
২. আবু লাহাব: ইসলামের চরম ও কট্টর শত্রু
- শত্রুতার শুরু: নবীজি (সা.) যখন সাফা পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে প্রথম ইসলামের দাওয়াত দেন, তখন আবু লাহাবই প্রথম পাথর ছুড়ে তাঁকে গালি দিয়েছিলেন।
- পারিবারিক সম্পর্ক ছিন্ন: নবীজির দুই কন্যার সাথে আবু লাহাবের দুই পুত্রের বিয়ে হয়েছিল। ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার অপরাধে তিনি জোর করে তাঁর ছেলেদের দিয়ে নবীজির কন্যাদের তালাক দেওয়ান।
- অভিশপ্ত চরিত্র: তাঁর চরম শত্রুতার কারণে পবিত্র কুরআনের ‘সূরা লাহাব’ নাজিল হয়, যেখানে তাঁর এবং তাঁর স্ত্রীর (উম্মে জামিল) ধ্বংসের কথা সরাসরি বলা হয়েছে।
- মৃত্যু: বদর যুদ্ধে কুরাইশদের শোচনীয় পরাজয়ের খবর শুনে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং এক যন্ত্রণাদায়ক চর্মরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তাঁর লাশ এতটাই দুর্গন্ধযুক্ত হয়েছিল যে কেউ পাশে যেতে পারছিল না।
আবু লাহাবের স্ত্রীর নাম ছিল
👉 Umm Jamil (উম্মে জামিল)
তার আসল নাম ছিল আর্ওয়া বিনতে হারব (Arwa bint Harb)। তিনি ছিলেন Abu Sufyan ibn Harb-এর বোন এবং কুরাইশদের প্রভাবশালী পরিবার থেকে আসা।
📖 কেন তিনি পরিচিত?
তিনি বিশেষভাবে পরিচিত কারণ—
- তিনি নবী Muhammad ﷺ-এর বিরুদ্ধে কঠোর শত্রুতা করতেন
- রাস্তায় কাঁটা ও কষ্টদায়ক বস্তু বিছিয়ে দিতেন, যাতে নবীজি কষ্ট পান
- তিনি ইসলাম প্রচারের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতেন
📜 কুরআনে উল্লেখ
পবিত্র কুরআনের Surah Al-Masad-এ তার সম্পর্কে বলা হয়েছে:
“وَٱمْرَأَتُهُۥ حَمَّالَةَ ٱلْحَطَبِ”
অর্থ: “আর তার স্ত্রী—যে জ্বালানি (কাঠ/কাঁটা) বহন করে।”
এখানে “কাঁটা বহনকারী” বলতে তার সেই কাজকেই বোঝানো হয়েছে—
👉 মানুষের ক্ষতি করা এবং নবীজির পথে কষ্ট সৃষ্টি করা।
⚠️ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
তার জীবনের মাধ্যমে বোঝা যায়—
- অহংকার ও বিদ্বেষ মানুষকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়
- সত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান করলে শেষ পরিণতি ভালো হয় না
হজরত খাদিজা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) এর পূর্ণাঙ্গ জীবনী পড়ুন👉
হজরত খাদিজা (রা.)-এর জীবনী সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে আপনি কি তাঁর ব্যবসায়িক জীবন নাকি নবীজির সাথে তাঁর দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে জানতে চান?
বদর যুদ্ধে আবু জাহেলের করুণ মৃত্যু ভিডিও দেখুন
আরও বিস্তারিত জানতে আমাদের অফিসিয়াল পেজ ভিজিট করুন।