🕌 আলোর দিশা -ইসলামিক পোস্ট

Home

কাবা শরীফের গোপন রহস্য

Alordesha islamic banner Alordesha islamic banner Alordesha islamic banner Alordesha islamic banner Alordesha islamic banner

কাবা ঘোর সম্বন্ধে জানুন

চিত্র: কাবা ঘোর এর চিত্র

কাবা শরীফের গোপন রহস্য

কাবা শরীফকে কেন্দ্র করে অনেক আধ্যাত্মিক এবং ঐতিহাসিক বিস্ময় বা রহস্য প্রচলিত রয়েছে যা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষকে আকর্ষিত করে। নিচে এর উল্লেখযোগ্য কিছু দিক তুলে ধরা হলো: ভিতরে কী আছে?: কাবা ঘরের ভেতরটি মূলত ফাঁকা এবং শান্ত। সেখানে তিনটি কাঠের স্তম্ভ রয়েছে যা ছাদকে ধরে রাখে এবং দেয়ালগুলো মার্বেল পাথর দিয়ে সজ্জিত। এছাড়াও সেখানে একটি সোনার বাক্স বা সিন্দুক থাকে যাতে সুগন্ধি (যেমন উড অয়েল ও গোলাপ জল) রাখা হয়, যা কাবা ধোয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর): এটি কাবার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত একটি জান্নাতি পাথর। মুসলিম বিশ্বাস মতে, এটি যখন জান্নাত থেকে পৃথিবীতে এসেছিল তখন এটি ধবধবে সাদা ছিল, কিন্তু মানুষের পাপের ছোঁয়ায় এটি কালো হয়ে গেছে। পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু: বৈজ্ঞানিক এবং আধ্যাত্মিক অনেক তত্ত্বে কাবা শরীফকে পৃথিবীর স্থলভাগের কেন্দ্রবিন্দু বা "অ্যাক্সিস মুন্ডি" (Axis Mundi) হিসেবে গণ্য করা হয়। কোনো কোনো বর্ণনামতে, পৃথিবীর প্রথম ভূখণ্ড বা জমিন এই কাবাকে কেন্দ্র করেই সৃষ্টি হয়েছিল। তাওয়াফ করার রহস্য: কাবাকে বাম দিকে রেখে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে (Anti-clockwise) সাতবার প্রদক্ষিণ করা হয়। এটি মহাকাশে গ্রহ-নক্ষত্রের ঘূর্ণন এবং পরমাণুর ভেতরের ইলেকট্রনের ঘূর্ণনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অনেকে মনে করেন। হাতিম বা হিজর-এ-ইসমাইল: কাবার উত্তর দিকে একটি অর্ধবৃত্তাকার দেয়াল ঘেরা স্থান রয়েছে যা মূল কাবারই অংশ ছিল। অর্থাভাবের কারণে ইব্রাহিম (আ.) এর নকশা অনুযায়ী কুরাইশরা তা কাবার ভেতরে ঢোকাতে পারেনি, তাই এখানে নামাজ পড়লে কাবার ভেতরে নামাজ পড়ার সমান সওয়াব পাওয়া যায়। মাকামে ইব্রাহিম: কাবার ঠিক পাশেই কাঁচের বাক্সে সংরক্ষিত একটি পাথর, যাতে হজরত ইব্রাহিম (আ.) এর পায়ের ছাপ অলৌকিকভাবে গেঁথে আছে। কাবা নির্মাণের সময় তিনি এই পাথরের উপর দাঁড়িয়েছিলেন।

কাবা শরীফের ভেতরের স্থাপত্য এবং এর নির্মাণের ইতিহাস সত্যিই বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। নিচে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. কাবার ভেতরের স্থাপত্য (Interior Architecture)

বাইরে থেকে কাবাকে একটি ঘনকাকৃতির ঘর মনে হলেও এর ভেতরটা বেশ সাদাসিধে কিন্তু গাম্ভীর্যপূর্ণ:

তিনটি খুঁটি: কাবার ভেতর তিনটি মজবুত কাঠের স্তম্ভ রয়েছে যা ছাদকে ধরে রাখে। এই কাঠগুলো প্রায় ১৩০০ বছরেরও বেশি পুরনো (আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রা.-এর সময়কার)।
দেওয়াল ও মেঝ: ভেতরের দেওয়ালের নিচের অংশ এবং মেঝে দামি মার্বেল পাথর দিয়ে ঢাকা। উপরের অংশটি সবুজ রঙের রেশমি কাপড়ে ঢাকা থাকে, যেখানে কোরআনের আয়াত খোদাই করা আছে। টেবিল বা বাক্স: খুঁটিগুলোর মাঝে একটি ছোট টেবিল বা সিন্দুক থাকে, যেখানে কাবা ধোয়ার সুগন্ধি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রাখা হয়। বাবে তাওবা: কাবার ভেতরে কোণায় একটি ছোট সোনার দরজা রয়েছে, যা দিয়ে ছাদের উপরে ওঠার সিঁড়ি ঢাকা থাকে।
২. নির্মাণের ইতিহাস (History of Construction)
ইসলামিক ইতিহাস অনুযায়ী, কাবা শরীফ বেশ কয়েকবার পুনর্নিমিত হয়েছে: প্রথম নির্মাণ: মুসলিম বিশ্বাস মতে, ফেরেশতাগণ অথবা আদি পিতা হজরত আদম (আ.) প্রথম কাবা নির্মাণ করেন। হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.): নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের পর কাবা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.) বর্তমান ভিত্তিটির ওপর কাবা পুনর্নির্মাণ করেন। কুরাইশদের পুনর্নির্মাণ: মহানবী (সা.)-এর নবুয়ত প্রাপ্তির পাঁচ বছর আগে কুরাইশরা কাবা সংস্কার করে। তখন অর্থের অভাবে তারা 'হাতিম' অংশটি মূল কাঠামোর বাইরে রেখে দেয়। এই নির্মাণেই হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে বিরোধ দেখা দিয়েছিল যা মহানবী (সা.) মীমাংসা করেন। পরবর্তী সংস্কার: এরপর আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের (রা.) এবং হাজ্জাজ বিন ইউসুফের শাসনামলে কাবার বড় ধরনের সংস্কার করা হয়। বর্তমানের কাঠামোটি মূলত তুর্কি সুলতান মুরাদ খানের আমলের (১৬৩১ সাল) নকশার ওপর ভিত্তি করে টিকে আছে।

কাবা শরীফের গিলাফ বা কিসওয়া পরিবর্তনের ঐতিহ্য এবং এর শৈল্পিক নির্মাণশৈলী অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। নিচে এর বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

১. কিসওয়া পরিবর্তনের নিয়ম ও সময়
পরিবর্তনের সময়: আগে প্রতি বছর হজের দিন (৯ জিলহজ) গিলাফ পরিবর্তন করা হতো। তবে বর্তমানে এটি হিজরি নববর্ষের প্রথম দিনে, অর্থাৎ ১লা মহরম তারিখে পরিবর্তন করা হয়। পরিবর্তন প্রক্রিয়া: প্রায় ১৫৯ জন বিশেষজ্ঞ টেকনিশিয়ান এবং কারিগর এই কাজে অংশ নেন। প্রথমে কাবার চারদিকের নতুন গিলাফের অংশগুলো ছাদ থেকে নিচে নামানো হয়। এরপর নতুন গিলাফটি সংযুক্ত করে ধীরে ধীরে পুরনো গিলাফটি নিচের দিকে নামিয়ে সরিয়ে ফেলা হয় যাতে কোনো অবস্থাতেই কাবা অনাবৃত না থাকে। সুগন্ধি ব্যবহার: গিলাফ পরিবর্তনের সময় কাবা শরীফকে উন্নত মানের উদ (Oud) এবং গোলাপ জল দিয়ে সুগন্ধিযুক্ত করা হয়।
২. নির্মাণশৈলী ও উপকরণ
কিসওয়া বা গিলাফ তৈরিতে ব্যবহৃত হয় বিশ্বের সবচেয়ে দামি উপকরণ এবং সূক্ষ্ম কারুকার্য:
উপকরণ: এটি তৈরিতে প্রায় ১০০০ কেজি প্রাকৃতিক কাঁচা রেশম ব্যবহৃত হয়, যা কালো রঙে রঞ্জিত থাকে। এতে প্রায় ১২০ কেজি সোনা এবং ১০০ কেজি রুপার সুতা দিয়ে ক্যালিগ্রাফি করা হয়।
ক্যালিগ্রাফি: গিলাফের গায়ে আল্লাহর নাম এবং পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন আয়াত অত্যন্ত সুন্দরভাবে খোদাই করা থাকে। বিশেষ করে গিলাফের 'বেল্ট' বা হিজাম অংশে স্বর্ণের সুতার কাজ সবচেয়ে বেশি নজরকাড়া।
আকার: একটি কিসওয়া প্রায় ১৪ মিটার লম্বা হয় এবং এটি ৪৭টি পৃথক টুকরো দিয়ে গঠিত।
৩. ঐতিহাসিক বিবর্তন
সূচনা: ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, ইয়েমেনের রাজা তুব্বা আবু কারিব আসাদ সর্বপ্রথম কাবায় গিলাফ চড়ানোর প্রথা শুরু করেন। ইসলাম পূর্ব যুগেও এই প্রথা প্রচলিত ছিল।
রঙের পরিবর্তন: বিভিন্ন যুগে কাবার গিলাফের রঙ ভিন্ন ছিল। একসময় এটি সাদা, সবুজ বা লাল রঙেরও ছিল। আব্বাসী খলিফাদের সময় থেকে এটি স্থায়ীভাবে কালো রঙের করা শুরু হয়।
কারখানা: বর্তমানে সৌদি আরবের মক্কায় অবস্থিত কিং আবদুল আজিজ কমপ্লেক্স ফর হোলি কাবা কিসওয়া-তে অত্যন্ত যত্নের সাথে এই গিলাফ তৈরি করা হয়।
গিলাফ পরিবর্তনের পর পুরনো গিলাফটিকে ছোট ছোট টুকরো করে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের উপহার হিসেবে দেওয়া হয়।

জমজম কূপের অলৌকিক ঘটনা

জমজম কূপের পানি এবং এর অস্তিত্বকে ঘিরে অনেক বিস্ময়কর ও অলৌকিক ঘটনা রয়েছে, যা বিজ্ঞান ও ধর্মীয় বিশ্বাস উভয় দিক থেকেই অনন্য। এর উল্লেখযোগ্য কিছু রহস্য ও ঘটনা নিচে দেওয়া হলো:
১. উৎপত্তির অলৌকিক কাহিনী
জমজম কূপের সৃষ্টি কোনো সাধারণ খননের মাধ্যমে হয়নি। প্রায় ৪০০০ বছর আগে, আল্লাহর নির্দেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর স্ত্রী হাজেরা (আ.) এবং শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)-কে মরুভূমিতে রেখে যান। তৃষ্ণার্ত শিশু ইসমাইলের কান্নারত অবস্থায় পায়ের আঘাতে (বা জিবরাইল আ.-এর ডানার আঘাতে) মাটি ফুঁড়ে এই পানির ধারা বের হয়। মরুময় বালুর মধ্যে হঠাৎ পানির এই উৎস বের হওয়া ছিল এক মহাবিস্ময়।
২. ৪০০০ বছর ধরে অফুরন্ত পানি
সাধারণত মরুভূমির কোনো কুয়া বা ঝরনা কয়েক বছর বা দশক পর শুকিয়ে যায়। কিন্তু জমজম কূপটি বিগত ৪০০০ বছর ধরে নিরবিচ্ছিন্নভাবে পানি সরবরাহ করে যাচ্ছে। প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৮০০০ লিটার পানি পাম্প করা সত্ত্বেও এর পানির স্তর কখনো শেষ হয় না। আধুনিক ভূতাত্ত্বিকদের কাছে এটি একটি বড় বিস্ময়।
৩. পানির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য
জীবাণুমুক্ত পানি: সাধারণত খোলা বা মাটির নিচের পানিতে শৈবাল বা ছত্রাক জন্মায়, কিন্তু জমজম কূপে কখনো কোনো শ্যাওলা বা পরজীবী জন্মায় না। এটি প্রাকৃতিকভাবেই বিশুদ্ধ।
খনিজ উপাদান: এই পানিতে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম লবণের পরিমাণ বেশি, যা ক্লান্তি দূর করতে এবং শরীরকে শক্তি জোগাতে সাহায্য করে। এতে প্রচুর পরিমাণে ফ্লোরাইড থাকায় এটি জীবাণুনাশক হিসেবে কাজ করে।
৪. ক্ষুধা ও রোগ মুক্তি
হাদিস অনুযায়ী, জমজম পানি যে নিয়তে পান করা হয়, তা পূরণ হয়। অনেক মানুষ বর্ণনা করেছেন যে, দীর্ঘ সময় ধরে শুধু জমজম পানি পান করে তারা বেঁচে ছিলেন এবং তাদের কোনো ক্ষুধা অনুভূত হয়নি। আধুনিককালেও অনেকে দাবি করেন যে, দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে এই পানি অলৌকিক ভূমিকা পালন করেছে।
৫. পানির স্তর রহস্য
১৯৭১ সালে এক জাপানি বিজ্ঞানী এটি পরীক্ষা করতে আসেন। তিনি দেখেন যে, পাম্প দিয়ে সেকেন্ডে হাজার হাজার লিটার পানি সরিয়ে নেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই কূপটি আবার পূর্ণ হয়ে যায়। মরুভূমির বালুকাময় স্তরে এত দ্রুত পানি রিচার্জ হওয়ার ঘটনা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অভাবনীয়।

মাকামে ইব্রাহিম সম্পর্কিত অলৌকিক তথ্য

মাকামে ইব্রাহিম হলো কাবা শরীফের ঠিক সামনে একটি কাঁচের ঘেরা স্তম্ভের ভেতরে সংরক্ষিত একটি বিশেষ পাথর। একে ঘিরে বেশ কিছু বিস্ময়কর এবং অলৌকিক তথ্য রয়েছে:
১. পাথরের ওপর পায়ের ছাপ: এই পাথরের ওপর হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর পায়ের ছাপ স্পষ্টভাবে অঙ্কিত আছে। অলৌকিক বিষয় হলো, কোনো ছেনি বা হাতুড়ি দিয়ে এই ছাপ খোদাই করা হয়নি। যখন ইব্রাহিম (আ.) কাবা ঘর নির্মাণ করছিলেন, তখন উঁচু দেয়াল গাঁথার সুবিধার্থে এই পাথরটি 'লিফট'-এর মতো কাজ করত। তিনি যখন পাথরের ওপর দাঁড়াতেন, পাথরটি নরম হয়ে যেত এবং তাঁর পায়ের ছাপ সেখানে বসে যেত।
২. পাথরটি উপরে-নিচে উঠানামা করত: কাবা ঘরের দেয়াল যত উঁচু হতো, এই পাথরটি ইব্রাহিম (আ.)-কে নিয়ে তত উপরে উঠে যেত। আবার কাজ শেষ হলে পাথরটি তাঁকে নিয়ে নিচে নেমে আসত। এটি ছিল সেই সময়ের এক মহান অলৌকিক নিদর্শন।
৩. জান্নাতি পাথর: রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস অনুযায়ী, হাজরে আসওয়াদ এবং মাকামে ইব্রাহিম—উভয়ই জান্নাত থেকে আসা দুটি ইয়াকুত পাথর। বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ যদি এই পাথর দুটির তেজ বা আলো নিভিয়ে না দিতেন, তবে এদের উজ্জ্বলতায় পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যবর্তী সবকিছু আলোকিত হয়ে যেত।
৪. হাজার বছরের সংরক্ষণ: হাজার বছর ধরে খোলা জায়গায় থাকা সত্ত্বেও এবং বিভিন্ন যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাঝেও এই পাথরের পায়ের ছাপ মুছে যায়নি। যদিও লক্ষ লক্ষ মানুষ এটি স্পর্শ করেছে (আগে এটি উন্মুক্ত ছিল), তবুও এর অলৌকিক অস্তিত্ব আজও টিকে আছে।
৫. কোরআনে উল্লেখ: পবিত্র কোরআনে এই স্থানটিকে অত্যন্ত সম্মানিত করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, "তোমরা মাকামে ইব্রাহিমকে নামাজের স্থান হিসেবে গ্রহণ করো" (সূরা বাকারা: ১২৫)। আজও হজ বা উমরার সময় তাওয়াফ শেষে এই পাথরের পেছনে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নামাজ পড়া সুন্নাত।

জান্নাতি এই কালো পাথরটি কেন জান্নাত থেকে পৃথিবীতে এসেছিল

হাজরে আসওয়াদ বা এই জান্নাতি কালো পাথরটি পৃথিবীতে আসার পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। ইসলামিক বর্ণনা অনুযায়ী এর পেছনের রহস্যগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. কাবা নির্মাণের পথপ্রদর্শক: পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, যখন হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.) আল্লাহর নির্দেশে কাবা ঘর পুনর্নির্মাণ করছিলেন, তখন একটি কোণ বা কোণা (Corner) বাকি ছিল। ইব্রাহিম (আ.) এমন একটি বিশেষ পাথর খুঁজছিলেন যা দিয়ে এই পবিত্র ঘরের শুরু চিহ্নিত করা যায়। তখন আল্লাহ তাআলার নির্দেশে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) জান্নাত থেকে এই পাথরটি নিয়ে আসেন।
২. আদম (আ.)-এর সাথে সম্পর্ক: কোনো কোনো বর্ণনা মতে, আদি পিতা হজরত আদম (আ.) যখন জান্নাত থেকে পৃথিবীতে এসেছিলেন, তখন তাঁর সাথে এই পাথরটি পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তীতে নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের সময় পাথরটি পাহাড়ের (জাবালে আবু কুবাইস) পেটে সংরক্ষিত ছিল এবং কাবা পুনর্নির্মাণের সময় সেটি আবার প্রকাশ করা হয়।
৩. তাওয়াফের শুরুর বিন্দু: জান্নাত থেকে এই পাথরটি আসার একটি বড় উদ্দেশ্য হলো ইবাদতের শুরু চিহ্নিত করা। কাবা শরীফ তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করার সময় কোথা থেকে গণনা শুরু হবে, হাজরে আসওয়াদ সেই 'স্টার্টিং পয়েন্ট' হিসেবে কাজ করে।
৪. একটি অলৌকিক সাক্ষী: হাদিসে বর্ণিত আছে যে, কিয়ামতের দিন এই পাথরটির একটি জিহ্বা এবং দুটি চোখ থাকবে। যারা একে ভক্তিভরে চুম্বন করেছে বা ইশারা করেছে, তাদের হয়ে এই পাথরটি আল্লাহর দরবারে সাক্ষ্য দেবে।
৫. মানুষের গুনাহ শুষে নেওয়া:রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "হাজরে আসওয়াদ যখন জান্নাত থেকে অবতীর্ণ হয়, তখন এটি দুধের চেয়েও সাদা ছিল। কিন্তু বনী আদমের (মানুষের) পাপ একে কালো করে দিয়েছে।" অর্থাৎ, এটি মানুষের গুনাহ শুষে নেওয়ার এক অলৌকিক ক্ষমতা রাখে বলেই এর নাম 'কালো পাথর' হয়েছে।

হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে মহানবী (সা.)-এর সেই বিখ্যাত বিরোধ মিমাংসার ঘটনা

হাজরে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে মহানবী (সা.)-এর সেই ঐতিহাসিক ও বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ মীমাংসার ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত চমৎকার। ঘটনাটি ঘটেছিল তাঁর নবুয়ত প্রাপ্তির পাঁচ বছর আগে:
১. কোন্দল ও সংঘাতের আশঙ্কা: কুরাইশরা যখন কাবা শরীফ পুনর্নির্মাণ করছিল, তখন দেয়ালের কাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছালে 'হাজরে আসওয়াদ' স্থাপন নিয়ে মক্কার গোত্রগুলোর মধ্যে তীব্র বিরোধ দেখা দেয়। প্রতিটি গোত্রই চাইছিল এই পবিত্র পাথরটি স্থাপন করার সম্মান তারা অর্জন করুক। বিরোধ এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে, তলোয়ার বের হয়ে গিয়েছিল এবং যুদ্ধের উপক্রম হয়েছিল।
২. প্রবীণ নেতার পরামর্শ: এই সংকটময় অবস্থায় আবু উমাইয়া ইবনে মুগিরা নামে এক প্রবীণ ব্যক্তি পরামর্শ দিলেন যে, "আগামীকাল সকালে যে ব্যক্তি সবার আগে পবিত্র কাবার চত্বরে (বাবুস সালাম দিয়ে) প্রবেশ করবেন, তিনিই এই বিবাদের ফয়সালা করবেন।" সবাই এই প্রস্তাবে রাজি হলো।
৩. মহানবী (সা.)-এর আগমন: পরদিন সকালে দেখা গেল, সবার আগে যিনি প্রবেশ করেছেন তিনি হলেন মুহাম্মদ (সা.)। তাঁকে দেখেই উপস্থিত সবাই খুশিতে চিৎকার করে উঠল— "আলামিন! আল-আমিন!" (বিশ্বস্ত ব্যক্তি এসেছেন)। সবাই তাঁর ওপর ফয়সালার দায়িত্ব ছেড়ে দিল।
৪. অলৌকিক প্রজ্ঞা ও সমাধান: মহানবী (সা.) কোনো এক পক্ষকে বেছে না নিয়ে এক অসাধারণ বুদ্ধিদীপ্ত সমাধান দিলেন: তিনি নিজের গায়ের চাদরটি জমিনে বিছিয়ে দিলেন। নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদটি তুলে চাদরের মাঝখানে রাখলেন। এরপর প্রতিটি গোত্রের প্রধানকে বললেন চাদরের এক একটি কোণা ধরতে। সবাই মিলে চাদরটি উঁচিয়ে যখন দেয়ালের সমান্তরালে নিয়ে এলেন, তখন মুহাম্মদ (সা.) নিজ হাতে পাথরটি কাবার দেয়ালে নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করলেন।
ফলাফল: এর ফলে প্রতিটি গোত্রই পাথরটি বহন করার সম্মান পেল এবং একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ নিশ্চিতভাবে এড়ানো সম্ভব হলো। এই ঘটনাটি মহানবী (সা.)-এর অসাধারণ নেতৃত্ব এবং শান্তির দূত হওয়ার এক বাস্তব প্রমাণ।

কাবা ঘর কারা ধংস করতে এসেছিল? কত সালে

পবিত্র কাবা ঘর ধ্বংস করতে এসেছিল ইয়েমেনের তৎকালীন খ্রিস্টান শাসক আবরাহা এবং তার বিশাল হস্তীবাহিনী।
এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ঘটেছিল ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের দিকে। ইসলামের ইতিহাসে এই বছরটিকে 'আমুল ফিল' বা 'হস্তী বছর' বলা হয়, কারণ আবরাহার বাহিনীতে বিশাল আকৃতির হাতি ছিল। কাকতালীয়ভাবে, এই একই বছর মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) জন্মগ্রহণ করেন।
আবরাহার অভিযানের মূল কারণ ও ফলাফল নিচে দেওয়া হলো:
আক্রমণের কারণ: আবরাহা ইয়েমেনের সানায় 'আল-কুল্লাইস' নামে একটি বিশাল গির্জা নির্মাণ করেছিলেন এবং চেয়েছিলেন আরবের মানুষ কাবার পরিবর্তে সেখানে তীর্থযাত্রা করুক। যখন আরবরা তার গির্জাকে প্রত্যাখ্যান করে, তখন তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে কাবা ধ্বংসের পরিকল্পনা করেন。 সৈন্য সংখ্যা: বিভিন্ন বর্ণনা অনুযায়ী, তার বাহিনীতে প্রায় ৬০,০০০ সৈন্য এবং ৯ থেকে ১৩টি হাতি ছিল। অলৌকিক পরাজয়: আবরাহার বাহিনী মক্কার কাছে পৌঁছালে আল্লাহর হুকুমে ঝাঁকে ঝাঁকে 'আবাবিল' পাখি পাথর নিক্ষেপ করে তাদের ধ্বংস করে দেয়। পবিত্র কোরআনের সূরা ফিল-এ এই ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে。 আবরাহা ছাড়াও ইতিহাসে আরও কয়েকবার কাবার ওপর আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, যেমন: ৯৩০ খ্রিস্টাব্দ: কারমাতিয়ান সম্প্রদায়ের নেতা আবু তাহির আল-জান্নাবি মক্কা আক্রমণ করে হাজরে আসওয়াদ চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৭৯ সাল: জুহাইমান আল-উতাইবির নেতৃত্বে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী কাবা শরীফ অবরোধ করেছিল।

আবাবিল পাখির সেই অলৌকিক পাথর নিক্ষেপের ঘটনা

আবাবিল পাখির সেই অলৌকিক ঘটনাটি ছিল ইতিহাসের এক চরম শিক্ষা, যা পবিত্র কোরআনের 'সূরা ফিল'-এ বর্ণিত হয়েছে। ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ:
১. আবরাহার দম্ভ: আবরাহা যখন তার বিশাল হস্তীবাহিনী নিয়ে মক্কার উপকণ্ঠে পৌঁছাল, তখন মক্কাবাসীরা তাদের সাথে যুদ্ধ করার মতো শক্তিশালী ছিল না। কুরাইশ নেতা আব্দুল মুত্তালিব (মহানবী সা.-এর দাদা) মক্কাবাসীদের নিয়ে পাহাড়ে আশ্রয় নিলেন এবং কাবার মালিক আল্লাহর ওপর এর রক্ষার দায়িত্ব ছেড়ে দিলেন।
২. হাতিদের অস্বীকৃতি: আবরাহার বাহিনীর প্রধান হাতিটির নাম ছিল 'মাহমুদ'। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যখনই হাতিটিকে কাবার দিকে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হতো, সেটি মাটিতে বসে পড়ত এবং এক কদমও এগোত না। কিন্তু যখন একে ইয়েমেন বা অন্য কোনো দিকে ঘোরানো হতো, তখন সেটি দ্রুত দৌড়াতে শুরু করত।
৩. আবাবিল পাখির আগমন: ঠিক সেই মুহূর্তে লোহিত সাগরের দিক থেকে আকাশ কালো করে ঝাঁকে ঝাঁকে ছোট ছোট পাখি আসতে শুরু করল, যাদের আমরা 'আবাবিল' নামে চিনি। প্রতিটি পাখির ঠোঁটে একটি এবং দুই পায়ে দুটি করে মোট তিনটি ছোট ছোট পাথর (কঙ্কর) ছিল।
৪. পাথরের আঘাত: এই কঙ্করগুলো ছিল মাটির তৈরি কিন্তু আগুনের মতো উত্তপ্ত। পাখিগুলো যখন আবরাহার বাহিনীর ওপর এই পাথরগুলো নিক্ষেপ করা শুরু করল, তখন সেগুলো বুলেটের মতো কাজ করছিল। পাথর যার মাথায় পড়ছিল, তার শরীর ছিদ্র হয়ে নিচের দিক দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল।
৫. ধ্বংসের চিত্র: পবিত্র কোরআনের ভাষায়, তারা 'খাওয়া তুষের' (চর্বিত ঘাসের) মতো গুঁড়ো হয়ে গিয়েছিল। আবরাহা নিজেও গুরুতর আহত অবস্থায় ইয়েমেনে ফিরে গিয়ে যন্ত্রণাদায়কভাবে মৃত্যুবরণ করেন। আল্লাহ তাআলা এভাবেই আবরাহার বিশাল বাহিনীকে ক্ষুদ্র পাখির মাধ্যমে ধ্বংস করে কাবার পবিত্রতা রক্ষা করেন। এই অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমেই বিশ্ববাসী জেনেছিল যে, কাবার রক্ষক খোদ আল্লাহ নিজে।

মক্কা বিজয়ের দিন মহানবী (সা.) কীভাবে কাবার ভেতরের মূর্তিগুলো অপসারণ করেছিলেন

মক্কা বিজয়ের সেই দিনটি (৮ম হিজরি/৬৩০ খ্রিস্টাব্দ) ছিল ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং আবেগময় মুহূর্ত। দীর্ঘ ৮ বছর পর মহানবী (সা.) বিজয়ী বেশে নিজ জন্মভূমিতে ফিরে এসেছিলেন। কাবার ভেতরের মূর্তি অপসারণের সেই ঐতিহাসিক ঘটনাটি ছিল নিম্নরূপ
১. রক্তপাতহীন বিজয়: মহানবী (সা.) যখন ১০,০০০ সাহাবীর বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন, তখন তিনি সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।" ফলে মক্কাবাসী বিনা যুদ্ধে আত্মসমর্পণ করে।
২. ৩৬০টি মূর্তি: তৎকালীন সময়ে কাবার চারদিকে এবং ভেতরে প্রায় ৩৬০টি ছোট-বড় মূর্তি ছিল। কুরাইশরা বিভিন্ন উপজাতীয় দেবতার পূজা করত। কাবার পবিত্রতা ফিরিয়ে আনতে এই মূর্তিগুলো অপসারণ করা জরুরি ছিল।
৩. মূর্তি ধ্বংসের অলৌকিক দৃশ্য: মহানবী (সা.) হাতে একটি ধনুক নিয়ে একে একে মূর্তির দিকে ইশারা করছিলেন এবং বলছিলেন:
"জা-আল হাক্কু ওয়া যাহাক্কাল বা-ত্বিল, ইন্নাল বা-ত্বিলা কা-না যাহুকা।" (অর্থ: সত্য এসেছে এবং মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে; নিশ্চয়ই মিথ্যা বিলুপ্ত হওয়ারই বিষয়। - সূরা বনি ইসরাঈল: ৮১) আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি কেবল ধনুক দিয়ে ইশারা করছিলেন আর মূর্তিগুলো উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। ৪. কাবার ভেতরে প্রবেশ: এরপর তিনি কাবার চাবি চেয়ে নেন এবং ভেতরে প্রবেশ করেন। ভেতরের দেওয়ালে বিভিন্ন ছবি ও চিত্র ছিল, তিনি সেগুলোও মুছে ফেলার নির্দেশ দেন। কাবা ঘরকে শিরকমুক্ত করে তিনি সেখানে নামাজ আদায় করেন।
৫. হজরত বেলাল (রা.)-এর আজান: মূর্তি পরিষ্কার করার পর মহানবী (সা.)-এর নির্দেশে হজরত বেলাল (রা.) কাবার ছাদে উঠে উচ্চস্বরে আজান দেন। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের এক যুগান্তকারী মুহূর্ত, যা ঘোষণা করেছিল যে কাবা এখন থেকে কেবল এক আল্লাহর ইবাদতের জন্য।

মক্কা বিজয়ের পর কাবার দায়িত্ব বা চাবিটি মহানবী (সা.) কার হাতে তুলে দিয়েছিলেন?

মক্কা বিজয়ের পর কাবার চাবি হস্তান্তরের ঘটনাটি মহানবী (সা.)-এর মহানুভবতা এবং ইনসাফের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ঘটনাটি ছিল এরকম:
১. চাবি কার কাছে ছিল?: জাহেলিয়াত আমল থেকেই কাবার চাবি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব ছিল বনু আবদুদ দার গোত্রের উসমান বিন তালহার কাছে। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি কাবার দরজা বন্ধ করে ছাদে লুকিয়ে ছিলেন।
২. চাবি সংগ্রহ: মহানবী (সা.) হজরত আলী (রা.)-কে পাঠান চাবিটি নিয়ে আসার জন্য। আলী (রা.) তাঁর কাছ থেকে চাবিটি সংগ্রহ করে আনেন এবং কাবার দরজা খোলা হয়। এরপর নবীজী (সা.) ভেতরে প্রবেশ করে ইবাদত শেষ করেন।
৩. আলী (রা.) ও আব্বাস (রা.)-এর চাওয়া:সেই সময় মহানবী (সা.)-এর চাচা হজরত আব্বাস (রা.) এবং হজরত আলী (রা.) চাইলেন যে, হাজিদের পানি পান করানোর (সাকায়া) দায়িত্বের পাশাপাশি কাবার চাবি রাখার (হিজাবা) সম্মানজনক দায়িত্বটিও যেন তাঁদের হাশেমি বংশকে দেওয়া হয়।
৪. কোরআনের আয়াত নাজিল: ঠিক সেই মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের এই আয়াতটি নাজিল করেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও..." (সূরা নিসা: ৫৮)।
৫. পূর্বের মালিককে ফেরত: এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর মহানবী (সা.) ব্যক্তিগত বা পারিবারিক স্বার্থের উপরে আমানত ও ইনসাফকে স্থান দিলেন। তিনি উসমান বিন তালহাকে ডাকলেন এবং চাবিটি তাঁর হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন:
"হে উসমান! এই নাও তোমার চাবি। আজ সৌজন্য ও প্রতিদানের দিন। এই চাবি চিরকাল তোমার বংশধরের কাছেই থাকবে। কোনো অত্যাচারী ছাড়া কেউ তোমাদের কাছ থেকে এটি ছিনিয়ে নেবে না।"
৬. আজকের অবস্থা: নবীজী (সা.)-এর সেই ঘোষণা অনুযায়ী, আজও কাবার চাবি উসমান বিন তালহার বংশধরদের (বনু শায়বা গোত্র) কাছেই সংরক্ষিত থাকে। সৌদি আরবের বাদশা বা অন্য যে কেউই ভেতরে প্রবেশ করতে চান না কেন, তাঁদের এই পরিবারের কাছ থেকেই চাবি চেয়ে নিতে হয়। উসমান বিন তালহা (রা.) নবীজী (সা.)-এর এই ব্যবহারে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তিনি সাথে সাথেই ইসলাম গ্রহণ করেন।

কাবা শরীফের বর্তমান সেই চাবি এবং তালাটি কী দিয়ে তৈরি সে সম্পর্কে জানুন

কাবা শরীফের বর্তমান চাবি এবং তালাটি অত্যন্ত শৈল্পিক এবং মজবুতভাবে তৈরি। এর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য নিচে দেওয়া হলো:
উপাদান: কাবার বর্তমান তালা এবং চাবিটি বিশুদ্ধ সোনা এবং ১৮ ক্যারেট নিকেল দিয়ে তৈরি। এটি বেশ ভারী এবং অত্যন্ত টেকসই। ক্যালিগ্রাফি: তালার উপরিভাগে পবিত্র কোরআনের আয়াত খোদাই করা আছে। বিশেষ করে সূরা নিসার সেই আয়াতটি (৫৮ নম্বর আয়াত) এতে খোদাই করা, যা চাবিটি আমানত হিসেবে ফিরিয়ে দেওয়ার সময় নাজিল হয়েছিল। চাবির দৈর্ঘ্য: চাবিটি প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার লম্বা। এটি একটি বিশেষ ব্যাগে রাখা হয় যা রেশমি কাপড় এবং সোনা-রুপার সুতা দিয়ে তৈরি (কিসওয়ার মতো)। পরিবর্তন: ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে কাবার তালা ও চাবি পরিবর্তন করা হয়েছে। সর্বশেষ তালাটি ২০১৩ সালে সৌদি আরবের তৎকালীন রাজা আবদুল্লাহর নির্দেশে লাগানো হয়েছিল, কারণ পুরনো তালাটি অনেক বছরের পুরোনো হয়ে গিয়েছিল। সংরক্ষণ: পুরনো তালা এবং চাবিগুলো বর্তমানে বিভিন্ন জাদুঘরে (যেমন: তুরস্কের তোপকাপি প্যালেস বা মক্কার মিউজিয়াম) সংরক্ষিত আছে। মজার তথ্য: কাবার দরজা এবং তালার চাবিটি খোলার অধিকার একমাত্র বনু শায়বা গোত্রের প্রধানের। এমনকি সৌদি বাদশাহও ভেতরে ঢুকতে চাইলে এই পরিবারের অনুমতি ও উপস্থিতি প্রয়োজন হয়।